‘ক্বলব-এ-মুনিব’ এর অবনমন
ইউনুস আল-গওহর

সাধারণ মানুষের ক্বলবকে বলা হয় ক্বলব-এ-স্নোবার (Senseless Heart)। এই ক্বলব-এ-স্নোবার এর কোনো বোধ শক্তি নেই। এই ক্বলব ষড় রিপুর ১,৮০,০০০ জাল দিয়ে আটকানো থাকে। অর্থাৎ এই ক্বলব বন্দী অবস্থায় থাকে।
কিন্তু আল্লাহ্ বলেছেন,
সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত নং ১১ (৬৪:১১)
ওয়া মাই ইয়াওমিন বিল্লাহি
যে আল্লাহর উপর ঈমান আনে
ইয়াহদি ক্বালবাহু
আল্লাহ তাদের ক্বলবে হেদায়েত দেন
তাহলে এই বন্দী ক্বলব কিভাবে হেদায়েত গ্রহণ করবে? হেদায়েত গ্রহণ করার জন্য প্রথমে তো ক্বলবকে মুক্ত হতে হবে। আর ক্বলবকে মুক্ত করতে হলে প্রয়োজন একজন কামিল মুর্শিদ। কামিল মুর্শিদ তাঁর রূহানী নজরের মাধ্যমে আমাদের ক্বলবের ১,৮০,০০০ জাল খুলে দেন। তখন ক্বলব থেকে এক জুস্যা বের হয়। কামিল মুর্শিদ সেই জুস্যাতে ইসমে-জাত আল্লাহ্ স্থাপন করেন। তখন ক্বলবের সে জুস্যা আল্লাহর জিকির করতে থাকে এবং সেখানে আল্লাহর নূর তৈরি হতে থাকে। এই নূর আমাদের ক্বলবকে তাকাব্বুর, বুগজ, হাসদ, এনাদ, সেহবাত এসব থেকে দূরে রাখে। ক্বলব এসব থেকে সালামাত হয়ে যায়। এজন্য এই ক্বলবকে বলা হয় ‘ক্বলব-এ-সেলিম’ (Secured Heart)। ‘সেলিম’ অর্থ ‘সালামাত’ বা ‘secured’। অর্থাৎ এই ক্বলব এখন তাকাব্বুর, বুগজ, হাসদ, এনাদ, সেহবাত থেকে সালামাত। এসব আসবে কিন্তু ক্বলবের নূর তা নষ্ট করে দিবে। এই ক্বলবের রুখ (direction) হয় ঈমান ও জান্নাত। এরা নামাজ-রোজা-জিকিরে মজা পায় এবং জান্নাত লাভের উদ্দেশ্যে তাই করতে থাকে। এদের রুখ (direction) মুর্শিদ বা রবের দিকে হয় না।
এরপর যদি আমাদের তকদিরে আল্লাহর দিদার লেখা থাকে, তবে মুর্শিদ আমাদের ক্বলবের আরো একটি জুস্যা বের করেন এবং তখন আমাদের ক্বলবের রুখ (direction) আল্লাহর দিকে হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ্ কোথায় থাকেন? আল্লাহ্ থাকেন মুর্শিদের ভিতরে। এজন্য তখন আমাদের চিন্তা-চেতনার রুখ (direction) মুর্শিদের দিকে হয়ে যায়। আমাদের মন থেকে জান্নাত ও হুর-পরীর লোভ চলে যায়। জাহান্নাম ও কবর আজাবের ভয় চলে যায়। তখন আর সে নামাজ-রোজা-জিকিরে মজা পায় না। সে তখন মুর্শিদের সোহবত, মুর্শিদের দর্শন, মুর্শিদের কথায় মজা পায়। সার্বক্ষণিক মুর্শিদকে নিয়েই ভাবে। এই ক্বলবকে বলা হয় ‘ক্বলব-এ-মুনিব’ (Directed Heart)।
‘ক্বলব-এ-মুনিব’ এর রুখ (direction) মুর্শিদের দিকে হয়। তখন আমাদেরকে সব কাজের উপর মুর্শিদকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাহলেই আমরা ধীরে ধীরে আল্লাহর দিকে এগিয়ে যাবো। কিন্তু আমরা যদি তখনও মুর্শিদের পরিবর্তে দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দেই, তাহলে আল্লাহ্ নারাজ হন এবং ধরে নেন যে, আমার এই বান্দা আমাকে পেতে চায় না। আমার কাছে আসতে চায় না। সে আমার চেয়ে দুনিয়া ও জান্নাতকেই বেশী ভালবাসে। তখন আল্লাহ্ পুনরায় আমাদের ক্বলবের রুখ ঘুরিয়ে দেন। আমাদের ক্বলবকে আল্লাহর জাত থেকে বিমুখ করে দেন। ক্বলব পুনরায় ‘ক্বলব-এ-সেলিম’ হয়ে যায় এবং সে আর কখনোই ‘ক্বলব-এ-মুনিব’ এ উন্নীত হতে পারবে না। আল্লাহ্ সে রাস্তা চিরতরে বন্ধ করে দেন।
আমরা যেনো এ পরিস্থিতিতে না পড়ি, সেজন্য আল্লাহ্ পবিত্র কোরান শরীফে আমাদেরকে তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে বলেছেন। ‘ক্বলব-এ-মুনিব’ হওয়ার পর যদি আমাদের কোনো ভুলত্রুটি হয়ে যায়, তবে তা যেনো আল্লাহ্ মাফ করে দেন এবং আমাদের ক্বলবকে যেনো অবনমিত না করেন।
সূরা আল-ইমরান, আয়াত নং ৮ (৩:৮)
রাব্বানা
হে আমাদের রব
লা তুঝিগ কুলুবানা
আমাদের ক্বলবকে (তোমার জাত থেকে) বিমুখ করে দিও না
বায়াদা ইজ হাদায়তানা
হেদায়েত দেওয়ার পর
ওয়া হাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমাতান
এবং আমাদের উপর তোমার খাস রহমত নাজিল করো
আল্লাহ্ তাঁর খাস রহমতের মাধ্যমে আমাদেরকে এই আজমাইশ থেকে বাঁচিয়ে থাকেন।
আমাদের ক্বলবের রুখ মুর্শিদের দিকে দুইটি কারণে হতে পারে –
১। ক্বলব-এ-মুনিব এর জন্য
২। আমাদের ভিতরে মুর্শিদের জুস্যার জন্য
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কিভাবে বুঝবো যে, মুর্শিদের প্রতি রুখ ক্বলব-এ-মুনিব এর জন্য নাকি মুর্শিদের জুস্যার জন্য হয়েছে? ক্বলব-এ-মুনিব এর জন্য যদি আমাদের ক্বলবের রুখ মুর্শিদের দিকে হয়ে থাকে, তবে আল্লাহর দিদারের পর ক্বলবের রুখ মুর্শিদের দিক থেকে ঘুরে আল্লাহর দিকে চলে যায়। কিন্তু মুর্শিদের প্রতি রুখ যদি মুর্শিদের জুস্যার কারণে হয়, তবে আল্লাহর দিদারের পরও ক্বলবের রুখ মুর্শিদের দিকেই থাকে। তার রুখের কোনো পরিবর্তন হয় না।