আল্লাহর দিদার
সুফি মাস্টার ইউনুস আল গওহর

আল্লাহর রূপ বা অবয়ব নিয়ে অনেক ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ রয়েছে — হিন্দু মতবাদ, মুসলিম মতবাদ, খ্রিস্টান মতবাদ এবং ইহুদি মতবাদ। এক এক ধর্মের অনুসারী নবী-রাসূল-আউলিয়ারা এক এক মতবাদ দিয়েছেন। সব মতবাদই সঠিক, কিন্তু আমরা তা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি এবং আল্লাহ্ প্রকৃতপক্ষে দেখতে কেমন তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছি।
আল্লাহর নূর প্রধানত দুই প্রকার:
১। আল্লাহর জাতি নূর
২। আল্লাহর সিফাতি নূর
আল্লাহর অনেক সিফাত বা গুণ রয়েছে যেমন—রহমান, রহিম, কুদ্দুস, শাকুর ইত্যাদি। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহর ৯৯টি সিফাতি বা গুণবাচক নাম রয়েছে। এগুলোর কোনোটাই আল্লাহর জাতি বা নিজস্ব নাম নয়, বরং তাঁর বিভিন্ন সিফাত বা গুণের নাম। কেবল একটি নামই তাঁর জাতি বা নিজস্ব বা ব্যক্তিগত নাম, আর সেটি হলো ‘আল্লাহ’।
এবাদত-বন্দেগী বা পূজা-অর্চনার মূল উদ্দেশ্য হলো আমাদের ক্বলবকে জাগ্রত ও পবিত্র করা। আর আমাদের ক্বলব তখনই পবিত্র হবে, যখন আমাদের ক্বলবে detergent বা সাবান প্রবেশ করবে। এই detergent বা সাবানই হলো আল্লাহর নূর। আর এই নূর আমাদের ক্বলবে প্রবেশ করে আল্লাহর নামের জিকিরের মাধ্যমে।
হাদিসঃ নুরুল হাদিস
লিকুল্লি সাইয়িন সাকালাতু
প্রত্যেক বস্তু পরিষ্কার করার জন্য একটি মাধ্যম থাকে
ওয়া সিকালাতুল কালবি জিকরুল্লাহি তায়ালা
আর ক্বলব পরিষ্কার করার মাধ্যম হলো আল্লাহর জিকির
আল্লাহ্ এই পৃথিবীতে ১,২৪,০০০ নবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন। প্রত্যেকের ক্বলবে আল্লাহ তাঁর যেকোনো একটি সিফাতি নামের নূর প্রদান করেছিলেন। তাই তাঁরা যখন তাঁদের উম্মতিদের শিক্ষা দিয়েছিলেন, তখন তাঁরা আল্লাহর সেই সিফাতি বা গুণবাচক নামের কল্যাণ ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছিলেন। উম্মতিদেরকে সেই আল্লাহর সেই সিফাতি নামের ফয়েজ দান করেছিলেন। ফলে আল্লাহর সেই সিফাতি নামের নূর ঐ সব উম্মতিদের ক্বলবে প্রবেশ করতো এবং তাদের মাঝে আল্লাহর সেই সিফাতের বহিঃপ্রকাশ ঘটতো।
এই নূরগুলো আল্লাহর নিজস্ব সত্তা বা জাতের নূর ছিল না। সেগুলো ছিল আল্লাহর বিভিন্ন সিফাতের নূর। আর সিফাতি নূরের প্রবেশাধিকার শুধুমাত্র আল্লাহর সিফাত পর্যন্ত, তা আল্লাহর জাত পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, ‘রহমান’ নাম থেকে যে নূর তৈরি হবে তা কেবলমাত্র আল্লাহর ‘রহমান’ সিফাতের বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে। সে জানে না আল্লাহর জাত কেমন। ‘কুদ্দুস’ নাম থেকে যে নূর তৈরি হবে তা কেবলমাত্র আল্লাহর ‘কুদ্দুস’ সিফাতের বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে। সে আল্লাহর জাতের পরিচয় জানে না। আল্লাহর সিফাতের কোনো আকার নেই, তা নিরাকার। তাই যখন কোনো নবী-রাসূল-আউলিয়া আল্লাহর সিফাতি নূরের মাধ্যমে ফয়েজ প্রাপ্ত হয়েছেন, তখন তারা বলেছেন আল্লাহ্ নিরাকার। আল্লাহর কোনো শারীরিক রূপ নেই। কারণ তারা তো আল্লাহর জাত পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি। ফলে আল্লাহর জাতের কোনো দিদার তারা পাননি। মুসা (আঃ) যেহেতু আল্লাহর ‘রহমান’ সিফাতের ফয়েজ পেয়েছিলেন সেজন্য তিনি আল্লাহর জাতের সামান্য এক ঝলকও সহ্য করতে পারেননি। তিনি বেহুশ হয়ে গিয়েছিলেন। তার পিছনের সব আলেমরা পুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু যখন শেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এই পৃথিবীতে আসলেন, তখন আল্লাহ্ তাঁর জাতি নাম ‘আল্লাহ্’ (ইসমে জাত আল্লাহ্) এর ফয়েজ দিলেন। এর পূর্বে আর কোনো নবী-রাসূল-আউলিয়া আল্লাহর জাতি নামের ফয়েজ পাননি। পরবর্তীতে হুজুর পাক (সাঃ) এর কাছ থেকে তাঁর উম্মতিরা আল্লাহর জাতি নামের ফয়েজ লাভ করেছিলেন। অন্য কোনো নবী-রাসূল ও তাদের উম্মতিরা এই সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেননি। তাই মুহাম্মদ (সাঃ)-এর উম্মতি হিসেবে আমরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান।
আল্লাহর জাতি নূরের সম্পর্ক আল্লাহর জাতের সাথে। তাই যারা আল্লাহর জাতি নামের ফয়েজ পেয়েছেন, একমাত্র তারাই আল্লাহর জাত পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন এবং আল্লাহর জাতের দিদার লাভ করেছেন। আর তাই তারা বলেছেন, আল্লাহ্ নিরাকার নন। তাঁর শারীরিক আকার রয়েছে। তিনি আমাদেরই মত। আমাদের মতই তাঁর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে। আর এটি পবিত্র কুরআন এবং বাইবেল দ্বারা প্রমাণিত।
আল-হাদিস: আল-বুখারী ৬২২৭, মুসলিম ২৮৪১
খালাকতাল আদামা আলা সুরাতিহি
আল্লাহ্ আদমকে তাঁর নিজস্ব সুরতে সৃষ্টি করেছেন।
পবিত্র বাইবেল, আদি পুস্তক ১:২৭
তাই ঈশ্বর মানুষকে তাঁর সুরতে সৃষ্টি করলেন, ঈশ্বরের সুরতেই তিনি তাকে সৃষ্টি করলেন; তিনি সৃষ্টি করলেন পুরুষ ও নারীদেরকে।
এবারে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাক। বিষয়টি খুবই বিস্ময়কর। আমরা যত জানবো ততই বিস্মিত হবো। এই রহস্যটি আমাদেরকে চমকে দিবে।
সূরা আর-রহমান, আয়াত নং ১-২ (৫৫:১-২)
আর-রহমান, আল্লামাল কুরআন
তিনি রহমান যিনি কোরান শিক্ষা দিয়েছেন
‘ইয়া রহমান’ হলো আল্লাহর একটি সিফাতি নাম। আল্লাহর এই ‘রহমান’ সিফাত থেকেই কোরান, বাইবেল ও অন্যান্য আসমানী কিতাব নাজিল হয়েছে। কেউ যখন আল্লাহর জাতের সাথে একীভূত হয়, তখন তার কাছে আল্লাহর সিফাত অনেকটাই মূল্যহীন হয়ে পড়ে। আল্লাহর সিফাতি ফয়েজ নিয়ে সে আর মাথা ঘামায় না। তাই যে আল্লাহর জাতি ফয়েজ পেয়েছে, তার কাছে এসব আসমানী কিতাবের আর কোনো গুরুত্ব থাকে না। আল্লামা ইকবাল মোমিনদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “এই রহস্য কেউ উপলব্ধি করতে পারে না। একজন মোমিনকে দেখে কারী মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে তিনিই কোরান।” একজন মোমিন যদি কোরান হয়ে থাকে, তবে একজন ওলী কি হবে? এটি সত্যিই ভাববার বিষয়।
এখন এটি স্পষ্ট যে, আল্লাহর দিদার এক এক ব্যক্তির জন্য এক এক রকম হয়েছে। কেউ আল্লাহর কোনো এক সিফাতের দিদার করেছে, আবার কেউ আল্লাহর জাতি দিদার পেয়েছে। কেউ আল্লাহকে নূরের মত দেখেছেন, তাই তিনি বলেছেন আল্লাহ দেখতে নূরের মত। কেউ আল্লাহকে ধোঁয়ার মত দেখেছেন, তাই তিনি বলেছেন আল্লাহ দেখতে ধোঁয়ার মত। কেউ আল্লাহকে আগুনের মত দেখেছেন, তাই তিনি বলেছেন আল্লাহ্ দেখতে আগুনের মত। কেউ কেউ আল্লাহর জাতের কিছুই দেখতে পাননি, তাই তারা বলেছেন আল্লাহ্ নিরাকার। আবার কেউ কেউ আল্লাহকে ১৭ বছরের এক সুদর্শন যুবকের মত দেখেছেন, তাই তারা বলেছেন আল্লাহ্ দেখতে ১৭ বছরের যুবকের মত। এইসব মতভেদের কারণ হলো আল্লাহর সান্নিধ্যের তারতম্য। কেউ আল্লাহকে দূর থেকে দেখেছেন, কেউ বা আল্লাহকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। আবার কেউ কেউ আল্লাহকে শুধু দেখেনি, বরং তাঁর সাথে আলিঙ্গনও করেছেন। তাই দৃষ্টিভঙ্গির এমন ভিন্নতা স্বাভাবিক বিষয়। আমরা যদি এই পৃথিবী থেকে চাঁদকে দেখি, তবে চাঁদকে আলোর একটি বৃত্তের মতো মনে হয়। কিন্তু আমরা যদি চাঁদের পৃষ্ঠে পৌঁছাই, তবে চাঁদকে আমাদের পৃথিবীর মতোই একটি গ্রহ মনে হবে — সেখানে আমাদের গ্রহের মতোই পাথর, মাটি, পাহাড়-পর্বত, গর্ত ইত্যাদি রয়েছে। অতএব, আল্লাহর সান্নিধ্যের স্তরের ভিন্নতার কারণেই আল্লাহ্ সম্বন্ধে ভিন্ন ভিন্ন উপলব্ধির সৃষ্টি হয়েছে।
আল্লাহ-তায়ালা সর্বপ্রথম আমাদের শেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ) কে তাঁর দিদার দিয়েছিলেন। তিনি আল্লাহর আলম আলম-এ-আহাদিয়াত এ গিয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। কারণ তিনি ইসমে-জাত আল্লাহ্ এর ফয়েজ পেয়েছিলেন। এর পূর্বে অন্য কোনো নবীকে ইসমে-জাত আল্লাহ্ দান করা হয়নি। পরবর্তীতে হুজুর আক (সাঃ) তাঁর খাস উম্মতিদের মাঝে এই ইসমে-জাত আল্লাহ্ দান করেছিলেন এবং তারাও আল্লাহর দিদারের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। তবে হুজুর পাক (সাঃ) এর সকল উম্মতিদেরকে এই ইসমে-জাত আল্লাহ্ দান করা হয়নি। অনেককেই আল্লাহর সিফাতি ফয়েজ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান জামানার ৯৯.৯৯% মুসলিমরা আল্লাহর দিদার বিষয়ে কোনো জ্ঞানই রাখেন না। যদিও পবিত্র কোরানে সুস্পষ্টভাবে আল্লাহর দিদারের কথা বলা হয়েছে।
আল্লাহ্ তাঁর দিদারের জন্য বিশেষ এক রূহানী সিস্টেম তৈরি করেছেন। এটা এমন নয় যে, আমরা বসে ধ্যান করলাম আর আল্লাহ্ আমাদের সামনে এসে হাজির হলেন। বরং রূহানীভাবে আমরা আল্লাহর কাছে গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবো।
আমাদের চোখই কি একমাত্র মাধ্যম যার সাহায্যে আমরা সবকিছু দেখতে পারি? মানুষ মনে করে, কোনো কিছু দেখতে হলে সুস্থ চোখের প্রয়োজন। কেউ অন্ধ হলে, মানুষ বলে, সে কিছুই দেখতে সক্ষম নয়। তাই যদি হবে, তাহলে আমরা ঘুমের ভিতরে কিভাবে স্বপ্ন দেখি? তখন তো আমাদের চোখ বন্ধ থাকে। তার মানে চোখ ছাড়াও এমন কিছু আমাদের মাঝে রয়েছে যার মাধ্যমে আমরা দেখতে পারি। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, আমাদের এই বাহ্যিক বা শারীরিক চোখ আল্লাহকে দেখতে সক্ষম নয়।
সূরা আল-আন’আম, আয়াত নং ১০৩ (৬:১০৩)
লা তুদরিকুহুল আবসার
তোমাদের চোখ আল্লাহর মহিমাকে অবলোকন করতে পারে না।
এ কারণেই আল্লাহ্ আমাদের মাথার ভিতরে একটি বিশেষ রূহ স্থাপন করেছেন যাকে বলা হয় লতিফা-এ-আনা। এই লতিফা-এ-আনা আল্লাহর জাতি আলমের মাখলুক। তাই এই লতিফা-এ-আনা আল্লাহর জাতি আলমে পৌঁছে আল্লাহর দিদার করতে সক্ষম। তাই এর মাধ্যমেই মানুষ আল্লাহর দিদার করতে পারে। কিন্তু আল্লাহর দিদারের জন্য সর্বপ্রথম বাঁধা হচ্ছে আল্লাহর অনুমতি পাওয়া। আল্লাহ্ যদি কাউকে তাঁর দর্শন দিতে না চান, তবে তিনি সরাসরি বলে দেন, “না। আমি তাকে দেখতে চাই না।” আর এখানেই তার রূহানী সফরের সমাপ্তি ঘটে। কারণ আমরা আল্লাহর সাথে তর্ক করতে পারি না। তিনি যদি কাউকে অনুমতি না দেন, তবে তা মেনে নেওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকে না। আর যাকে আল্লাহ্ তাঁর দিদার দিতে চান, তাকে আল্লাহ্ একজন কামিল মুর্শিদের সন্ধান দেন। সেই মুর্শিদ তখন তাকে আল্লাহর দিদারের জন্য প্রস্তুত করে তোলেন।
সূরা আল-কাহাফ, ১৭ নং আয়াত (১৮:১৭)
মাই ইয়াহদি আল্লাহু
আল্লাহ যাকে হেদায়েত দেন
ফাহুয়াল মুহতাদি
সেই হেদায়েত পায়
ওয়া মাই ইউদলিল
এবং যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান
ফালান তাজিদা লাহু
তখন কখনই তার জন্য পাবে না
ওয়ালিয়াম মুর্শিদা
একজন ওলী মুর্শিদ
রূহানিয়াতের মূল ভিত্তিই হলো নফস পবিত্র করা এবং ক্বলব জাগ্রত করা। তাই এই দুইটি বিষয় হলো আল্লাহর দিদারের পূর্ব শর্ত।
সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত নং ২১ (৫১:২১)
ওয়া ফী আনফুছিকুম, আফালা তুবসিরুন
আমি তো তোমার নফসের আড়ালেই রয়েছি, তোমরা কি তা অনুধাবন করবেনা?
একজন কামিল মুর্শিদ তাঁর শিষ্যের প্রতি স্নেহ, ভালবাসা প্রদর্শন করেন না। তাঁর কোনো প্রশংসা করেন না। কারণ মুরিদের অপবিত্র নফস তার ভুল ব্যাখ্যা করে তার ভিতরে মিথ্যা অহংকার ও দাম্ভিকতা সৃষ্টি করতে পারে। যার ফলে তার রূহানী উন্নতি ব্যহত হতে পারে। এ কারণে বেশীর ভাগ মুর্শিদ খুব কঠোর ও রুক্ষ মেজাজের হয়ে থাকেন। আর মুরিদ ভাবে, আমার মুর্শিদ কেনো সব সময় আমাকে বকাবকি করেন? আমি তো সব সময় তাঁর খেয়াল রাখি। তিনি কেনো সব সময় আমার দোষ ধরেন? তিনি কেনো এতো রুক্ষ স্বভাবের? তার ভিতরে কি কোনো দয়ামায়া নেই? কিন্তু মুর্শিদ এ সবই তার মুরিদের রূহানী উন্নতির জন্যই করে থাকেন। রূহানী সফরে সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো নফসকে পবিত্র করা। এর চেয়ে কঠিন আর কিছুই নেই।
সরকার গওহর শাহী (রঃ) বলেছেন,
“নফসকে পবিত্র করার চেয়ে পাথর বা লোহার টুকরা চিবিয়ে খাওয়াও অনেক সহজ।”
বর্তমান সময়ের তথাকথিত রূহানী ব্যক্তিত্বরা বলে থাকেন, “নিজেকে ভালবাসো। নিজেকে ভালবাসার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই।” কিন্তু এটি সম্পূর্ণরূপে রুহানিয়াতের পরিপন্থী। রূহানীতে আমাদেরকে ঠিক এর উল্টাটাই করতে হবে। অর্থাৎ নিজেকে সবার থেকে নীচু মনে করতে হবে। রূহানীয়াতে কখনই নফসের বন্ধু হওয়া যাবে না। রূহানিয়াতে চলার পথে কেউ যদি আমাদেরকে গালি দেয়, কেউ যদি আমাদেরকে অসম্মান করে, কেউ যদি আমাদের নিন্দা করে, কেউ যদি আমাদের ক্ষতি করে, তবে মুর্শিদ আমাদেরকে ধৈর্য্য ধরতে বলেন। কারণ নফস পবিত্র করার রহস্য লুকিয়ে আছে নফসকে উপেক্ষা করার মধ্যে। নিজেকে উপেক্ষা করা নয়। উপেক্ষা করতে হবে আমাদের নফসকে। উপেক্ষা করতে হবে নফসের খায়েশকে। আমাদের চাহিদাকে জীবনধারণের মৌলিক চাহিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এর বাইরে যেকোনো কিছুকেই পাপ বলে গণ্য করা হয়। এ কারণে রূহানী ব্যক্তিরা লোকালয় ছেড়ে জঙ্গলে গিয়ে দিন কাটান। কারণ জঙ্গলে কোনো প্রলোভন নেই। জঙ্গলে থাকলে আমরা জীবনের অনেক সমস্যা ও প্রলোভন থেকে আমাদেরকে দূরে রাখতে পারি। কিন্তু লোকালয়ে তা সম্ভব নয়। যুগে যুগে আউলিয়ারা জঙ্গলে ১২ বছর সাধনা করেছেন নফস পবিত্র করার জন্য। তাই রূহানিয়াতে সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে নফস পবিত্র করা। বাকি বিষয়গুলো অনেকটাই সহজ।
সূরা আল-আলা, আয়াত ১৪ (৮৭:১৪)
কাদ আফলাহা মান তা ঝাক্কা
নিশ্চয়ই সে সাফল্য লাভ করেছে যে পরিশুদ্ধ হয়েছে
কঠোর সাধনার মাধ্যমে আমাদের নফস পবিত্র হওয়ার পর, মুর্শিদ আমাদের ক্বলবকে তাঁর রূহানী নজরের মাধ্যমে জাগ্রত করেন এবং সেখানে ইসমে জাত আল্লাহ্ স্থাপন করেন। এর ফলে ক্বলবে জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর জাতি নূর তৈরি হতে শুরু করে। এক বলা হয় ‘শারাহ-এ-সদর’ বা ‘বক্ষ উন্মোচন’। ৩ বছর পর ক্বলবের জিকির পোক্ত হয়ে যায় এবং সেখান থেকে আল্লাহর জাতি নূর ধীরে ধীরে আমাদের রক্তের সাথে মিশতে থাকে। রক্তের মাধ্যমে নূর আমাদের সমগ্র শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তখন অন্যান্য লতিফাগুলোতে রক্তের মাধ্যমে নূর পৌঁছাতে থাকে এবং তারাও ধীরে ধীরে জাগ্রত হয়ে আল্লাহর জিকির করতে শুরু করে এবং নূর তৈরি করতে থাকে। আমাদের সমস্ত শরীর নূরানী হয়ে যায় যাকে বলা হয় ‘রওশন জামির’। এরপর আমাদের মুর্শিদ আমাদের লতিফা-এ-আনাকে ‘ইয়া হু’ জিকিরের মাধ্যমে জাগ্রত করতে থাকেন। ‘আল্লাহ্’ হচ্ছে আল্লাহর জাতের লঘু নির্যাস (diluted form) আর ‘হু’ হচ্ছে আল্লাহর জাতের মূল নির্যাস (mother tincture)। আমরা যখন আমাদের কপালে ইসমে জাত আল্লাহ্ ও ইসমে মুহাম্মাদ এর তাসাব্বুর করি তখন লতিফা-এ-আনা সক্রিয় হয় এবং ‘ইয়া হু’ জিকিরের মাধ্যেম উৎপন্ন হওয়া নূর গ্রহণ করতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে তাসাব্বুর ছাড়া জিকির ব্যর্থ হয়, কারণ কোনো লতিফাই সে নূর গ্রহণ করতে পারে না।
সুলতান হক বাহু বলেছিলেন,
“তাসাব্বুর ব্যতীত জিকির যেনো গাধার ডাক”
যীশু খ্রীস্ট বলেছিলেন,
যারা ক্রুশ বহন করবে, তারাই আমাকে খুঁজে পাবে।
এর অর্থ কী? এখানে ক্রুশ বলতে আমাদের দেহের ভেতরে অভ্যন্তরীণ লতিফাগুলোর বিন্যাসকে বোঝানো হয়েছে। লতিফাগুলো একটি ক্রুশের আকৃতিতে বিন্যস্ত থাকে। এই কারণেই যীশু বলেছিলেন যে, যারা ক্রুশ বহন করবে তারাই আমাকে খুঁজে পাবে। অর্থাৎ, যারা জাগ্রত এবং নূরানী ক্রুশ বহন করবে, তারাই যীশুকে খুঁজে পাবে। তারাই ঈশ্বরকে খুঁজে পাবে।
লতিফা-এ-আনা ৩টি পর্দা দ্বারা আবৃত রয়েছে:
১. জুলমানি পর্দা (Cover of darkness)
২. নূরানী পর্দা (Cover of divine light)
৩. রব্বানী পর্দা (Cover of God)
যখন লতিফা-এ-আনা ‘ইয়া হু’ জিকির শুরু করে তখন জুলমানি পর্দা সরে যায়। তখন লতিফা-এ-আনা নূরানী পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে। ফলে তখন সে শুধুমাত্র আল্লাহর নূর দেখতে পায়। আর এটাই আল্লাহর তাওহীদ বা একত্ববাদ। এ পর্যায়ে লতিফা-এ-আনা আল্লাহর দিদারের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। আমাদের ঘুমের ভিতরে মুর্শিদ আমাদের লতিফা-এ-আনাকে নিয়ে চলে যান ‘মকাম-এ-মেহমুদ’ এ। এই ‘মকাম-এ-মেহমুদ’ হচ্ছে ‘আলম-এ-ওয়াহেদিয়াত’ এর একটি বিশেষ স্থান যেখান থেকে আল্লাহকে সামনা-সামনি দেখা যায়। কিন্তু আল্লাহ্ এই আলমে অবস্থান করেন না। আল্লাহ্ থাকেন ‘আলম-এ-আহাদিয়াত’ এ। আর এই ‘আলম-এ-আহাদিয়াত’ এবং ‘আলম-এ-ওয়াহেদিয়াত’ সামনা-সামনি অবস্থিত। তাই ‘আলম-এ-ওয়াহেদিয়াত’ এর ‘মকাম-এ-মেহমুদ’ এ বসে মুরিদ আল্লাহর দিদার লাভ করেন।
আল্লাহর দিদারের ফলে আল্লাহর ছবি মুরিদের লতিফা-এ-আনাতে চলে আসে। এরপর লতিফা-এ-আনা মুরিদের দেহে ফিরে আসে। তখন লতিফা-এ-আনা থেকে আল্লাহর ছবি মুরিদের চোখে চলে আসে। কারণ আমাদের চোখ লতিফা-এ-আনার সাথে সম্পর্কিত। মুরিদ তখন ৪০ দিন ধরে তার চোখের আল্লাহর ছবি তার ক্বলবের উপর তাসাব্বুর করতে থাকেন। ফলে একদিন মুরিদের ক্বলবে আল্লাহর ছবি চলে আসে। আর তখনই মুরিদ একজন কামিল ওলী হয়ে যান এবং তার উপর প্রতিদিন ৩৬০ বার আল্লাহর তাজাল্লী পড়তে থাকে। আর এজন্য বলা হয়েছে,
আল-হাদিস
ক্বালবে মুমিন আরশুল্লাহ
মোমিনের ক্বলব আল্লাহর আরশ
ক্বালবে মুমিন বায়তুল রব
মোমিনের ক্বলব আল্লাহর ঘর
নবী মুসা (আঃ) আল্লাহর সাথে কথা বলার জন্য সিনাই পাহাড়ে (Mount of Sinai) যেতেন। সেখানে যাওয়ার আগে তাঁকে ৪০ দিন রোজা রাখতে হতো এবং তারপর তিনি আল্লাহর সাথে কথা বলতে পারতেন। মুসা (আঃ) এর জন্য এটি ছিল খুবই কষ্টকর। তাই তিনি একদিন আল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আমার রব, আমি যখনই আপনার সাথে কথা বলতে চাই, তখনই আমাকে ৪০ দিন রোজা রাখতে হয়। আমি এতে খুবই ক্লান্ত। এটা কি সম্ভব নয় যে, আপনি আমার সাথেই থাকবেন?” তখন আল্লাহ বললেন, “হ্যাঁ, কেনো সম্ভব নয়? যে কেউ তার অন্তরে আমার নাম স্মরণ করলে আমি সেখানেই আছি।”
আল-হাদিস: আইনুল ফুকরা, পৃষ্ঠা নং ৪৯
ইন্না জালিসুন মা আ মান জাকারানি
“নিশ্চয়ই আমি তাদের সাথে বসি, যারা অন্তরে আমার নাম স্মরণ বা জিকির করে।”
এবার আসা যাক, আল্লাহর দিদারের প্রমাণের বিষয়ে। কারো আল্লাহর দিদার হয়েছে কিনা তার দুইটি প্রমাণ রয়েছে:
১। ঐ ব্যক্তি যদি কোনো পাথর বা মাটির টুকরার উপর নজর দেয়, তবে তা সোনা হয়ে যায়। কিন্তু এটি শয়তানও করতে সক্ষম। তাই এটি কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নয়।
২। ঐ ব্যক্তি যদি কারো ক্বলবের উপর নজর দেয়, তবে তার ক্বলব জাগ্রত হয়ে যায়। শয়তান কখনই এটি করতে পারে না। তাই এটি হলো একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।