কোরানের আলোকে নফসের স্তরসমূহ
ইউনুস আল-গওহর

সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত ২১ (৫১:২১)
ওয়া ফী আনফুসিকুম
আমি তো তোমাদের নফসের আঁড়ালেই রয়েছি
আফালা তুবসিরুন
তোমরা কি বাশিরাত হাসিল করবে না?
হাদিস
মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু
যে তার নফসকে চিনেছে, প্রকৃতপক্ষে সে তার রবকে চিনেছে
কোরান ও হাদিসের আলোকে বোঝা যায় যে, আমাদের ও রবের মাঝে মূল বাঁধা হচ্ছে আমাদের নফস। নফসকে অতিক্রম করেই আমাদেরকে রবের কাছে পৌঁছাতে হয়। অথচ এই নফস নিয়ে এখন আর কোনো আলেম-ওলামারা কথা বলেন না। মানুষ জানেই না যে, নফস বলে কিছু আছে। নফস পবিত্র করা তো দূরে থাক।
কোরান-এ-মজিদে নফসের চার অবস্থার বর্ণনা করা হয়েছে –
১। নফস-এ-আম্মারা
২। নফস-এ-লাওয়ামা
৩। নফস-এ-মূলহেমা
৪। নফস-এ-মুৎমায়েন্না
সূরা ইউসুফ, আয়াত নং ৫৩ (১২:৫৩)
ইন্নান নাফসাল আম্মারাতু বিস সুউয়ি
নিশ্চয় নফস আমাদেরকে মন্দ কাজের হুকুম (আমর) করে‘আম্মারা’ শব্দটি ‘আমর’ থেকে এসেছে। ‘আমর’ অর্থ ‘হুকুম দেওয়া’।
যখন কেউ জন্মগ্রহণ করে তখন তার সাথে লতিফা-এ-নফস সংযুক্ত করা হয়। নবী করিম (সাঃ) বলেছেন,
সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৭১০৮
আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত।
তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেন,
“তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যার সাথে একজন শয়তান জ্বীন জন্মগ্রহণ করেনি”।
তারা বললো, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনার সাথেও কি জন্মগ্রহণ করেছিল?”
রাসূলুল্লাহ জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, আমার সাথেও জন্মগ্রহণ করেছিল। কিন্তু সে আমার সোহবতে পাক হয়ে গিয়েছে এবং সে আমাকে শুধুই ভাল কাজের পরামর্শ দেয়।”
এই শয়তান জ্বীন কি? এই শয়তান জ্বীনই আমাদের নফস। আর এই নফসকে পাক করাই আমাদের অর্ধেক ঈমান।
আল-হাদিসঃ সহীহ মুসলিম
আত তুহুরু সাতরুল ঈমান
পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক
আমরা এ হাদিস থেকে কি বুঝেছি? গোছল করে পাকসাফ হয়েছি, আমার অর্ধেক ঈমান হয়ে গেছে। কিন্তু এটা তো বেধর্মীরাও করে থাকে। তাহলে তাদের কি অর্ধেক ঈমান হয়ে গেছে? তারা কি অর্ধেক মোমিন হয়ে গেছে? আসলে এর অর্থ তা নয়। এখানে পবিত্রতা বলতে নফসকে পবিত্র করার কথা বলা হয়েছে। নফস পবিত্র হলে অর্ধেক ঈমান হবে আর ক্বলব পবিত্র হয়ে জিকির করা শুরু করলে বাকি অর্ধেক ঈমান হবে। অর্থাৎ তাজকিয়াতুন নফস ও তাসফিয়াতুন ক্বলব মিলে হলো পুরা ঈমান।
নফস যখন আমাদের ভিতরে থাকে তখন সে নাপাক থাকে এবং সে ইবলিশের সাথে সংযুক্ত থাকে। এই নফসের মুর্শিদ হচ্ছে ইবলিশ। যখনই নফস কোনো বিপদে পড়ে বা দুর্বল হতে থাকে, তখনই সে তার মুর্শিদকে ডাকে এবং সে তার সাহায্যের জন্য চলে আসে। সাধারণ মানুষ নফস পাক করতে কেনো ব্যর্থ হয়? কারণ তাদের কোনো মুর্শিদ থাকে না। নফস দুর্বল হতে থাকলে সে তার মুর্শিদের সাহায্য চায় এবং সে এসে তাকে সাহায্য করে যাতে সে আবারো শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষ কার সাহায্য চাইবে? তাদের তো কোনো মুর্শিদ নেই। আর আল্লাহ্ তো সরাসরি সাহায্য করেন না। এ কারণে সাধারণ মানুষ নফস পাক করতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু যাদের মুর্শিদ থাকে তারা সফল হয়। কারণ মুর্শিদ তার মুরিদকে সাহায্য করেন।
পবিত্র কোরান শরীফে আল্লাহ্ বলেছেন,
সূরা আশ-শামস, আয়াত নং ৯ (৯১:৯-১০)
কাদ আফলাহা মান ঝাক্কাহা
সেই সফল হয়েছে যে তার নফসকে পরিশুদ্ধ করেছে
ওয়াকাদ খাবা মান দাছ ছাহা
আর সে ব্যর্থ হয়েছে যে নফসকে কলুষিত করেছে
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নফসের নাপাকি কি? নফস শয়তানের জারসুমা (cell) থেকে জন্ম লাভ করে। এ জ্বীন জাতির অন্তর্ভুক্ত। এরা নার (fire) দিয়ে তৈরি। এদের সকল কার্যকলাপ শয়তানী। তাকাব্বুর, হাছদ, বুগজ, এনাদ, সেহবাত এসব কিছু আমাদের ভিতরে এসেছে এই নফসের কারণে। একে কিভাবে পাক করা যায়? এর খাদ্য নার বা আগুন। নার খেয়েই এ শক্তিশালী হয়। আমাদেরকে যদি কোনো ঠাণ্ডা খাবার দেওয়া হয়, তবে তা খেয়ে আমরা মজা পাই না। ঠাণ্ডা রুটি, ঠাণ্ডা মাংস খেয়ে আমরা মজা পাই না। খাবার গরম হলেই মজা লাগে। এর কারণ কি? কারণ এই নফস গরম পছন্দ করে। নার তার খাদ্য। এখন নফসকে পাক করতে হলে তাকে নার এর পরিবর্তে নূর খাওয়াতে হয়। কিন্তু সে তো আর নূর খেতে চাইবে না। এজন্য প্রথমে তাকে অভুক্ত রেখে দুর্বল করে ফেলতে হয়। যখন সে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে বেঁচে থাকার জন্য আকুতি করে, তখন তাকে নূর খেতে দেওয়া হয় এবং কালেমা পড়তে বলা হয়। সে বাধ্য হয়ে কালেমা পড়ে এবং নূরকে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে। কালেমা পড়ার কারণে নূর তৈরি হয় এবং এ নূরই তখন থেকে সে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে এবং সে পাক হয়ে যায়। নাপাক নফসকে নফস-এ-আম্মারা বলে। এই নফস-এ-আম্মারা আমাদেরকে গুনাহ করতে বাধ্য করে। কোনো জিনিস তার ভালো লাগলে সে তা যেকোনো উপায়ে হাছিল করবে। তার জন্য যদি তাকে গুনাহ করা লাগে তবে তা সে করবে। গুনাহকে সে গুনাহ মনে করে না। বরং গুনাহ করে সে আনন্দ পায়। মানুষকে দুঃখ-কষ্ট দিয়ে, মানুষের ক্ষতি করে, মানুষকে হেয় করে সে আনন্দ পায়। মদ খেয়ে, জুয়া খেলে, নাইট ক্লাবে নাচ-গান করে, জেনা করে, গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরে সে মজা পায়। এগুলোকে সে খারাপ মনে করে না। কিন্তু যখন তার ভিতরে আল্লাহর নূর এসে যায়, তখন তার মধ্যে অনুশোচনা সৃষ্টি হয়। সে আমাদেরকে দিয়ে গুনাহ করাবে কিন্তু তার জন্য তার অনুশোচনা হবে। একে বলে নফস-এ-লাওয়ামা। কারণ সে গুনাহ করার পর নিজেকে ‘মালামাত’ বা তিরস্কার করে। অনুশোচনাই তওবার ভিত্তি। যখন নফসের ভিতরে নূর অনেক বেড়ে যায় তখন তার সাথে মুর্শিদের নফসের সংযোগ হয়ে যায়। তখন মুর্শিদের তরফ থেকে এলহাম আসে। যখনই সে কোনো গুনাহ করতে যায়, তখন মুর্শিদের কাছ থেকে তা না করার জন্য এলহাম আসে এবং সে গুনাহ থেকে বিরত থাকে। এই এলহাম নবী-রাসূলদের কাছ থেকেও আসতে পারে। এই এলহামের কারণে তাকে নফস-এ-মুলহেমা বলা হয়। এ স্তর থেকেও নফসের অবনমন হতে পারে। মুর্শিদের প্রতি গুস্তাকির কারণে বা কোনো গুনাহের কারণে নফস-এ-মুলহেমা থেকে নফস-এ-লাওয়ামা এবং নফস-এ-লাওয়ামা থেকে নফস-এ-আম্মারা হয়ে যেতে পারে। আর যখন নফস-এ-মুলহেমার উপর আল্লাহর তাজাল্লী পড়ে, তখন সে পুরাপুরি পাক হয়ে যায় এবং তখন তাকে বলা হয় নফস-এ-মুৎমায়েন্না। এ নফসের আর কখনো অবনমন হয় না। একমাত্র দিদার-এ-এলাহী ওলীদের মধ্যে এই স্তরের নফস থাকে।
“জোর যার মুল্লুক তার’। যদি আমাদের নফস শক্তিশালী হয় তবে সে আমাদের শরীরকে তার মত পরিচালনা করবে। আর যদি আমাদের রূহ আল্লাহর নুরে শক্তিশালী হয়ে যায়, তবে আমাদের রূহ আমাদের শরীরকে তার মত পরিচালনা করবে। অর্থাৎ নফস শক্তিশালী হলে আমাদের জিসম নফসের গোলামী করবে, আর যদি রূহ শক্তিশালী হয় তবে সে রূহের গোলামী করবে।
নফস-এ-আম্মারা সাধারণত আজলি জাহান্নামী বা কাফেরদের ভিতরে থাকে। আর যারা আজলী মোমিন তারা যদি কোনো পরহেজগার ঘরে জন্ম গ্রহণ করে, তবে সে ঘরে অন্যদের কোরান তেলাওয়াত, নাত শরীফ, দরূদ শরীফ পাঠ এসব শুনে শুনে তাদের নফস লাওয়ামা হয়ে যায়। অথবা এবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে তাদের নফস লাওয়ামা হয়ে যায়। এক্ষেত্রে মুর্শিদের সাহায্য লাগে না।
সূরা আল-আরাফ, আয়াত নং ২০৪ (৭:২০৪)
ওয়া ইযা কুরিয়াল কুরআনু ফাছ তামি ঊ লাহু ওয়া আনসিতু লাআল্লাকুম তুরহামুন
আর যখন ক্বোরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগ সহকারে সেটা শ্রবণ করো এবং নিশ্চুপ থাকো, যাতে তোমাদের উপর দয়া হয়।
নফসকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে হলে একজন কামিল মুর্শিদের কোনো বিকল্প নেই। তাই আল্লাহ-তায়ালা পবিত্র কোরান শরীফে বারবার ওছিলা তালাশ করতে বলেছেন। এই ওছিলাই হচ্ছে কামিল মুর্শিদ। আর মুর্শিদের কাজ হচ্ছে, তার মুরিদের তাজকিয়াতুন নফস ও তাসফিয়াতুন ক্বলব করার মাধ্যমে আল্লাহর দিদার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া।