দাজ্জাল ও ইমাম মেহদী (আঃ)
সহীহ মুসলিম: ২৯৩৩
এটি আনাস বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস: নবী মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, “আমি তোমাদেরকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করছি। সে তার ডান চোখে অন্ধ হবে এবং নিশ্চয়ই তোমাদের রব একচক্ষু নন। তার দুই চোখের মাঝখানে লেখা থাকবে: কাফ ফে রে।”
এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, দাজ্জাল তার ডান চোখে অন্ধ হবে, কিন্তু আমাদের রব অন্ধ হবেন না। এর মানে কী? যদি আমরা এই বাক্যটির আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করি, তাহলে দাজ্জালের ডান চোখ শারীরিকভাবে অন্ধ হবে। ঠিক আছে? কিন্তু সমস্যাটি হলো এর পরের বাক্যটিতে, যেখানে বলা হয়েছে আমাদের রব (আল্লাহ) একচক্ষু নন। এ কথার কি কোনো অর্থ হয়? আমরা সবাই জানি যে, আল্লাহর পক্ষে একচক্ষু হওয়া অসম্ভব। তাহলে আমাদের নবী মুহাম্মদ (সঃ) কেনো দাজ্জালের চোখের সাথে আমাদের রবের চোখের তুলনা করলেন? এটা কি বোকামি নয়? অবশ্যই এটি বোকামি। সুতরাং, যদি আমরা এই বাক্যটির আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করি, তবে এর কোনো অর্থ হয় না। আমাদের নবী (স)-এর এই বক্তব্যের পিছনে নিশ্চয়ই কোনো গূঢ় অর্থ রয়েছে।
আল্লাহ আমাদের দুই প্রকার জ্ঞান দান করেছেন। একটি হলো জাগতিক জ্ঞান এবং অন্যটি হলো আধ্যাত্মিক জ্ঞান। জ্ঞান আমাদের আলোকিত করে। আর আমাদের চোখ এই পৃথিবীকে আমাদের কাছে দৃশ্যমান করে তোলে। সুতরাং, জ্ঞান আমাদের চোখের মতো। জাগতিক জ্ঞান শরীয়াহ নামে এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞান তরিকাহ ও হাকিকাহ নামে পরিচিত। এই হাদিসে আমাদের নবী মুহাম্মদ (স) আমাদের দুই চোখকে দুই প্রকার জ্ঞানের সাথে তুলনা করেছেন – বাম চোখ জাগতিক জ্ঞানের (শরীয়াহ) সাথে এবং ডান চোখ আধ্যাত্মিক জ্ঞানের (তরিকাহ ও হাকিকাহ) সাথে তুলনা করেছেন। দাজ্জাল তার ডান চোখে অন্ধ থাকবে এর অর্থ হলো তার কোনো আধ্যাত্মিক জ্ঞান থাকবে না। ইবলিশের (শয়তানের) মতো তারও কেবল জাগতিক জ্ঞান থাকবে। আল্লাহ ইবলিশকে কোনো আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সুযোগ দেননি। অন্যদিকে, আল্লাহ সব ধরনের জ্ঞানের অধিকারী। সুতরাং, তিনি একচক্ষু নন। আমাদের সকল নবী, রাসূল এবং ওলীগণকেও উভয় প্রকার জ্ঞানের অধিকার দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, দাজ্জালের মতো তাঁরা তাঁদের ডান চোখে অন্ধ নন। আল্লাহ উভয় প্রকার জ্ঞানই দান করেছেন, কিন্তু দাজ্জালের জন্য থাকবে কেবল এক প্রকার জ্ঞান। এটাই এই হাদিসের প্রকৃত গূঢ় ব্যাখ্যা।
এই হাদিসের শেষ অংশে ইঙ্গিত করা হয়েছে, “তার দুই চোখের মাঝখানে লেখা থাকবে: কাফ ফে রে”। আসুন এখন এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যাক। যদি একজন কাফেরের (অবিশ্বাসী) কপালে ‘কাফের’ শব্দটি লেখা থাকে, তাহলে একজন মুমিনের (বিশ্বাসী) কপালেও ‘মুমিন’, একজন নবীর কপালেও ‘নবী’, একজন রাসূলের কপালেও ‘রাসূল’ এবং একজন ওলীর কপালেও ‘ওলী’ লেখা থাকা উচিত। যদিও এটি একটি সত্য এবং তা সত্যিই তাঁদের কপালে লেখা রয়েছে। প্রত্যেক ব্যক্তির কপালেই এই ধরনের ছাপ থাকে – সে জান্নাতী হোক বা জাহান্নামী হোক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কারা তা দেখতে পারেন? শুধুমাত্র রূহানী দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিরাই তা দেখতে পারেন। সাধারণ মানুষের পক্ষে তা দেখা সম্ভব নয়। সুতরাং, দাজ্জালের কপালে লেখা অক্ষরগুলো দেখে তাকে শনাক্ত করা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব।
এবার দাজ্জাল সম্পর্কিত আরেকটি হাদিস নিয়ে আলোচনা করা যাক।
মিশকাত শরীফ: ৫২৫৪
এটি আবু সায়ীদ আল-খুদরী (রহঃ) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস: নবী মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, “সত্তর হাজার মুসলিম আলেম দাজ্জালের হাতে বায়েত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করবে”।
একবার মন দিয়ে ভেবে দেখুন, এটা কীভাবে সম্ভব? ঐ সত্তর হাজার মুসলিম আলেমদের সবাই কি একেবারে নির্বোধ হবেন? তারা কি স্বল্প বুদ্ধি সম্পন্ন হবেন? যদি তারা দাজ্জালের কপালে লেখা ‘কাফ ফে রে’ অক্ষরগুলো দেখতে পান, তাহলে তারা কেন দাজ্জালের হাতে বায়েত (আনুগত্যের শপথ) হবেন? এটা কি আমাদের কাছে কোনো অর্থ বহন করে? সুতরাং, এটা স্পষ্ট যে, আমাদের কেউই ঐ অক্ষরগুলো দেখতে সক্ষম হবে না। কেবলমাত্র রূহানী দৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিরাই তা দেখতে সক্ষম হবেন।
‘দাজ্জাল’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো প্রতারক। যদি কারো উপাধি প্রতারক হয়, তবে সে কী ধরনের প্রতারণা করবে? বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা রয়েছে। যদি কেউ আপনাকে বিপদে ফেলে যায়, সেটাও এক ধরনের প্রতারণা। কিন্তু দাজ্জাল কীভাবে প্রতারণা করবে? তার কাছে কেবল আমাদের ধর্মের (শরীয়াহ) জাগতিক জ্ঞান থাকবে; তার কাছে আধ্যাত্মিক জ্ঞান (তরিকাহ ও হাকিকাহ) থাকবে না। সে ইসলামী শরীয়াহর একজন কঠোর অনুসারী হবে। সে বলবে যে, ধর্মটি কেবল জাগতিক জ্ঞান নিয়ে গঠিত, ধর্মে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের কোনো সুযোগ নেই। তার জাগতিক জ্ঞান এতটাই সমৃদ্ধ হবে যে তা মুসলিম আলেমদেরও মুগ্ধ করবে। সে শরীয়াহর আইনকানুন কঠোরভাবে মেনে চলবে। সে শরীয়াহকে এতটাই কঠোরভাবে পালন করবে যে, অন্য কোনো ধর্মীয় নেতা তা অনুকরণ করতে পারবে না। আর একারণেই তারা তার সামনে মাথা নত করবে। তার কাছে প্রচুর জাদুকরী শক্তিও থাকবে যা নিশ্চিতভাবে তাদেরকে তাকে ইমাম মাহদী (আঃ) হিসেবে বিশ্বাস করতে বাধ্য করবে। সুতরাং, ঐসব আলেমদের অনুসারী অধিকাংশ মানুষও দাজ্জালকে ইমাম মাহদী (আঃ) হিসেবে বিশ্বাস করতে শুরু করবে এবং তারা সবাই তাঁর প্রতি আনুগত্যের শপথ নেবে। এভাবেই দাজ্জাল আমাদের অধিকাংশকে ধোঁকা দেবে।
আমরা কীভাবে দাজ্জালকে চিনতে পারব? ইমাম মাহদী (আঃ) এবং দাজ্জালের মধ্যে পার্থক্য করা কেবল তখনই সম্ভব হবে, যখন আমাদের ক্বলবে আল্লাহর নূর থাকবে। ইমাম মাহদী (আঃ) হলেন ঐশ্বরিক নূরের একটি গোলক এবং যাদের অন্তরে ঐশ্বরিক নূর (ইসমে জাত আল্লাহর নূর) রয়েছে, তারা চুম্বকের মতো তাঁর দিকে আকৃষ্ট হবে। যত হাদিসই মুখস্ত করুক না কেন, যতই কোরানে হাফেজ হোক না কেনো, সে একদিন দাজ্জালের অনুসারী হবেই, যদি তার অন্তরে আল্লাহর কোন নূর না থাকে। একমাত্র নূরানী ক্বলবই পারে দাজ্জালের প্রতারণা থেকে আমাদেরকে রক্ষা করতে।
একটি হাদিসে আরো উল্লেখ আছে যে, প্রত্যেক জাতির মধ্যে একজন দাজ্জাল থাকবে। তাহলে আমি কিভাবে বলতে পারি যে, দাজ্জাল ইহুদীদের মধ্য থেকে হবে? ইহুদী দাজ্জাল কিভাবে আমাদেরকে ধোঁকা দিবে? কেনো ৭০,০০০ মুসলিম আলেম ইহুদী দাজ্জালের আনুগত্য করবেন? আমরা কিভাবে তা মানতে পারি? আসল কথা হলো, দাজ্জাল হল একদল লোক যারা তাদের ধর্মের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তারা হবে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের (শরীয়তের) কঠোর অনুসারী। কিন্তু তারা তাদের নিজ নিজ ধর্মের রূহানিয়াত থেকে অনেক দূরে থাকবে। তার মানে তারা তাদের ডান চোখে অন্ধ হবে যেমনটি আমাদের নবী (সঃ) বলেছেন। আমরা জানি যে, আল্লাহ সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য যুগে যুগে নিম্ন মর্যাদার ৩৬০ জন দরবেশের একটি সেট পাঠিয়েছেন। একইভাবে, প্রতিটি জাতি যুগে যুগে নিম্ন মর্যাদার ১০০ জন দাজ্জালের মুখোমুখি হয়েছে এবং সর্বদা একজন মেগা দাজ্জাল ছিল। আমাদের জাতিও দাজ্জালের একটি সিরিজের সম্মুখীন হয়েছে। যাই হোক, এই বিশ্বের শেষ পর্বে একজন চ্যাম্পিয়ন দাজ্জাল থাকবে। সর্বশ্রেষ্ঠ দাজ্জাল। সবচেয়ে শক্তিশালী দাজ্জাল। সবচেয়ে বিস্তৃত দাজ্জাল। প্রকৃতপক্ষে, শেষ জামানার এই দাজ্জালই হবে সেই আলোচিত দাজ্জাল যার হাতে আমাদের ৭০,০০০ আলেম বায়েত গ্রহণ করবেন। এই দাজ্জালের মুখোমুখি হবেন আমাদের ইমাম মেহেদী (আ.)। কিন্তু ইমাম মেহেদী (আ.) নিজে থেকে কিছুই করবেন না। যা করার করবেন ঈসা (আঃ)। এই দাজ্জালের বিরুদ্ধে ঈসা (আঃ) বা যীশু খ্রীস্ট যুদ্ধ ঘোষণা করবেন। তিনি হবেন ইমাম মেহেদী (আঃ) এর সেনাদলের প্রধান সেনাপতি।