শারাহ-এ-সাদর

সূরা আয-যুমার এর ২২ নং আয়াত (৩৯:২২)
আফামান শারাহাল লাহু সাদরাহু লিল ইসলাম
ইসলামে দাখিল হওয়ার জন্য ইসমে জাত আল্লাহর মাধ্যমে যে শারাহ-এ-সদর করেছে
ফাহুয়া আলা নুরিম মির রাব্বিহ
তখন সে রবের নিকট থেকে নূর পেতে শুরু করে
ফাওয়াইলুল লিলকাসিয়াতি কুলুবুহুম মিন যিকরিল্লাহ
এবং ধ্বংস তাদের জন্য যাদের ক্বলব এতই কঠিন যে সেখানে আল্লাহর জিকির প্রবেশ করতে পারে না
উলাইকা ফি দালালিম মুবীন
ঐ সব লোক স্পষ্টতই পথভ্রষ্ট
কোরানের এ আয়াত মতে ইসলামে দাখিল হতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই ‘শারাহ-এ-সাদর’ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ‘শারাহ-এ-সাদর’ কি জিনিস? ‘শারাহ’ অর্থ ‘উন্মোচন করা বা খোলা’ আর ‘সাদর’ অর্থ ‘বক্ষ’। তাহলে ‘শারাহ-এ-সাদর’ এর অর্থ হচ্ছে ‘বক্ষ উন্মোচন করা বা খোলা’। তাহলে নিশ্চয় আমাদের বক্ষ বন্ধ রয়েছে যেটাকে আমাদের খুলতে হবে। কিন্তু খুলবো কিভাবে? ছুরি-চাকু দিয়ে কেটে তো আর বুক খোলা যাবে না। তাহলে বোঝা যাচ্ছে এটা জাহেরি খোলা নয়, এটা বাতেনি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
কামিল-পীর-এ-তরিকতের কাজ কি? তিনি তার মুরিদের শারাহ-এ-সদর করেন। আল্লাহ-তায়ালা ‘আমর-এ-কুন’ এর মাধ্যমে সকল রূহদেরকে সৃষ্টি করে তাঁর সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করালেন। অতঃপর সব রূহদেরকে দুনিয়া ও জান্নাতের আরাম-আয়েশ দেখালেন এবং তা থেকে কোনো একটা বেছে নিতে বললেন। সেদিন যারা দুনিয়াকে বেছে নিয়েছিল, তাদের তকদিরে ফেরেশতারা জাহান্নাম লিখে দিয়েছিল। আর যারা জান্নাত বেছে নিয়েছিল, তাদের তকদিরে জান্নাত লিখে দিয়েছিল। আর কিছু রূহ ছিল যারা সেদিন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। আলাহ তাদের তকদির ফাঁকা রেখে দিয়েছিলেন। এরপর আল্লাহ্ বললেন,
সূরা আল-আরাফ, আয়াত নং ১৭২ (৭:১৭২)
আলাস্ত বে রাব্বুকুম?
আমি কি তোমাদের রব নই?
কালু
তারা বললো
বালা
নিশ্চয়ই
শাহিদানা
আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি
এর পর আল্লাহ-তায়ালা সব রূহদেরকে ঘুম পড়িয়ে দেন। এই ঘুমকে আল্লাহ-তায়ালা মৃত্যুর ভাই আখ্যায়িত করেছেন। এজন্য আল্লাহ-তায়ালা কোরানে বলেছেন, মানুষ দুই বার মারা যায় এবং দুই বার জীবিত হয়।
যখন কোনো বাচ্চা জন্মগ্রহণ করে, তখন তার ক্বলবের ভিতরে এই ঘুমন্ত রূহ এবং তার সাথে আরো পাঁচ লতিফা একত্রিত করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় এবং সেই ক্বলবকে ১,৮০,০০০ জাল দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর তার সাথে চারটি পাখী সংযুক্ত করে দেওয়া হয়। এই পাখীগুলো এইসব ঘুমন্ত রূহের উপর বুগজ, হাসদ, এনাদ প্রবেশ করাতে থাকে। তাহলে এইসব ঘুমন্ত রূহের পক্ষে কিভাবে সম্ভব তা প্রতিরোধ করা? কখনই সম্ভব নয়। আমরা সারাদিন জাহেরি এবাদত করছি। এই এবাদত দিয়ে কি এইসব রূহদেরকে মুক্ত করা সম্ভব? কখনই না। আমাদের সেদিকে কোনো খেয়ালও নেই। এইসব রূহ ও লতিফাসমূহ তখনই তাদের কাজ করবে যখন তারা আজাদ ও বেদার হবে।
হুজুর পাক (সাঃ) বলেছেন,
আইনুল ফুকরা, পৃষ্ঠা ১১৮
লা সালাতা ইল্লা বি হুজুরিল ক্বালব
ক্বলবের হাজিরি ব্যতীত সালাত গ্রহণযোগ্য নয়
কিন্তু আমাদের ক্বলব কিভাবে নামাজে হাজির হবে? সে তো বেহুশ অবস্থায় বন্দী হয়ে পড়ে আছে।
আল্লাহ-তায়ালা বলেছেন,
সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত নং ১১ (৬৪:১১)
ওয়া মান ইউমিম বিল্লাহি
যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে
ইয়াহদি ক্বালবাহু
আল্লাহ তাদের ক্বলবে হেদায়েত দেন
কিন্তু আমাদের ক্বলব কিভাবে হেদায়েত গ্রহণ করবে? সে তো বেহুশ অবস্থায় বন্দী হয়ে পড়ে আছে।
ইসলামের শর্ত কি?
ইকরারুম বিল লিসান
মুখে স্বীকার করা
ওয়া তাসদিকুম বিল ক্বলব
এবং ক্বলবের মাধ্যমে সত্যয়িত করা
কিন্তু আমাদের ক্বলব কিভাবে সত্যায়িত করবে? সে তো বেহুশ অবস্থায় বন্দী হয়ে পড়ে আছে।
এজন্য পবিত্র কোরান শরীফে ইসলামে দাখিল হওয়ার জন্য শারাহ-এ-সদর করার কথা বলা হয়েছে। শারাহ-এ-সদর কি? যে রূহগুলো ক্বলবের ভিতরে বন্দী হয়ে পড়ে আছে, তাদেরকে সেখান থেকে মুক্ত করার নামই শারাহ-এ-সদর। মুক্ত করতে হলে ১,৮০,০০০ জাল খুলতে হবে। কিন্তু তা আমরা কিভাবে খুলবো? আমাদের পক্ষে তো তা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একজন কামিল পীর-এ-তরিকত। তিনি তার নজরের মাধ্যমে এই ১,৮০,০০০ জাল পুড়িয়ে দেন। তখন তারা মুক্ত হয়ে যায়। এজন্য আল্লাহ-তায়ালা পবিত্র কোরান শরীফে বলেছেনঃ
সূরা আল-কাহাফ, আয়াত নং ১৭ (১৮:১৭)
ওয়ামান ইউদলিল
এবং যাকে পথভ্রষ্ট করেন
ফালান তাজিদা লাহু
তখন তুমি কখনই তার জন্য পাবে না
ওলিয়াম মুর্শিদা
একজন ওলী মুর্শিদ
মুর্শিদ-এ-কামিল পাওয়া না গেলে এই রূহদেরকে আজাদ ও বেদার কে করবে? অর্থাৎ শারাহ-এ-সদর কে করবে? আর শারাহ-এ-সদর না করতে পারলে তো ইসলামে দাখিল হওয়া যাবে না।
মুর্শিদ-এ-কামিল ১৮০০০০০ জালি কিভাবে পুড়িয়ে দেন? এই সক্ষমতা একজন মুর্শিদের তখনই হয়, যখন সে আল্লাহর দিদার লাভ করেন। মুর্শিদের লতিফা-এ-আনা যখন আল্লাহর দিদার লাভ করে, তখন আল্লাহ্ তাকে বলেন, “তুমি এখন নীচে চলে যাও। যে তোমাকে দেখবে সে যেনো আমাকে দেখলো।” কাকে দেখার কথা আল্লাহ্ বলেছেন? লতিফা-এ-আনার মধ্যে আল্লাহর যে চেহারা প্রবেশ করেছে তাকে দেখার কথা বলা হয়েছে। এরপর সেই লতিফা-এ-আনা যখন ফিরে আসে, তখন আল্লাহর ছবি লতিফা-এ-আনা থেকে মুর্শিদের চোখে চলে যায়। মুর্শিদ তখন তা তার ক্বলবে বসান। আর যখন তা ক্বলবে চলে আসে তখন প্রতিদিন ৩৬০ বার তাজাল্লী পড়া শুরু হয়।
সুলতান হক বাহু (রঃ) বলেছিলেন,
মুর্শিদ দা দিদার হে বাহু
হে (সুলতান হক) বাহু, মুর্শিদের দিদার
মেনু লাখ করোরান হাজ্জান
আমার কাছে লাখো কোটি হজ্বের সমতুল্য
কেনো মুর্শিদের দিদার লাখো কোটি হজ্বের সমতুল্য? কারণ এখানে দিদার মুর্শিদের নয়। দিদার হচ্ছে মুর্শিদের ভিতরে আল্লাহর যে ছবি রয়েছে তার। আল্লাহর সেই ছবির দিদার লাখো কোটি হজ্জ্বের সমতুল্য। এই দিদার সবার হয় না। কিছু খাস মুরিদ থাকে যাদেরকে মুর্শিদ তার ভিতরে আল্লাহর যে ছবি রয়েছে তার দিদার দেন। এটা আম মুরিদদের জন্য নয়। সরকার গওহর শাহী (রঃ) এর তো লাখ লাখ মুরিদ ছিলো। তারা কেনো গুমরাহ হলো? তাদের কি লাখো কোটি হজ্জ্ব হয়েছিল? অবশ্যই না। কারণ সরকার তাদেরকে সেই বাতেনি দিদার দেননি।
লতিফা-এ-আনা থেকে আল্লাহর নকশা বা ছবি যখন মুর্শিদের চোখে চলে আসে, তখন তাকে বলা হয় আহলে নজর। এইসব আহলে নজর মুর্শিদরাই আমাদের ক্বলবের উপর নজর দিয়ে ১৮০০০০০ জাল পুড়িয়ে ফেলতে পারেন। যখন এই জালগুলো পুড়ে যায়, তখন ছয় লতিফা মুক্ত হয়ে যায়। প্রত্যেক লতিফা তার নিজ নিজ আসনে বসে যায়। এরপর মুর্শিদ লতিফা-এ-ক্বলবে আল্লাহর ইসম-এ-জাত এর বীজ বপন করেন। বীজ বপনের পর সেখানে প্রতিদিন পানি দিতে হয়। তাই মুর্শিদ ৭ দিন যাবত সেই ক্বলব রুপী জমিনের উপর নজরের মাধ্যমে নূর দিতে থাকেন। আমাদেরকে বলা হয়, তুমি ক্বলবের সাথে জিকির মেলাতে থাকো। কিন্তু সেটা শুধুমাত্র আমাদের মনোযোগ স্থাপনের জন্য। আসল কাজ তো মুর্শিদ করেন। তিনি নজরের মাধ্যমে নূর দিয়ে সেই ইসম-এ-জাত বীজকে লালন করতে থাকেন। এরপর এই সাত দিনের মধ্যে হঠাৎ করে একদিন কম্পনের মাধ্যমে ক্বলব বেদার হয়ে যায় এবং সে ‘আল্লাহ্’ ‘আল্লাহ্’ করতে থাকে। ক্বলব ধীরে ধীরে জিকির বাড়াতে থাকে এবং সেখানে নূর তৈরি হতে থাকে। এভাবে তিন বছর পার হয়ে গেলে, ক্বলবের জিকির পোক্ত হয়ে যায়। এরপর ক্বলব তার নূর আমাদের রক্তের ভিতরে দিতে থাকে। ধীরে ধীরে সমস্ত শরীরে নূর ছড়িয়ে পড়ে। শারাহ-এ-সদর এর ফলে অন্যান্য লতিফাগুলো রক্তের সমুদ্রে ভাসতে থাকে। ফলে রক্তের মাধ্যমে তারা এখন নূর পেতে থাকে। এই নূরই তাদের খাদ্য। এই নূর পাওয়ার ফলে প্রথমে আমাদের রূহ বেদার হয়। সেখানে স্পন্দন অনুভূত হয়। তখন মুর্শিদ রূহকে জিকির দেন। রূহ জিকির করতে থাকে এবং সেও নূর তৈরি করতে থাকে। ক্বলব ও রূহের মাধ্যমে নূরের প্রোডাকশন বেড়ে যায় এবং তা আমাদের রক্তে মিশতে থাকে। এটাই হচ্ছে পীর-এ-তরিকত এর কাজ। আর এজন্যই তিনি বায়েত করান।
আমীর খসরু বলেছিলেন,
নজর জিনকি কিমিয়া হো গেয়ি, সোনা কর দে বাট
যার নজর পরশ পাথর হয়ে গেছে, সে পাথরকে সোনা বানিয়ে দেয়
এটার জাহেরি ও বাতেনি দুই অর্থ আছে। যাদের চোখে আল্লাহর নকশা চলে এসেছে, তারা কোনো পাথর বা মাটির ঢেলার উপর নজর দিলে তা সোনা হয়ে যায়। এটা এর জাহেরি অর্থ। কিন্তু এ ক্ষমতা শয়তানেরও আছে। তাহলে আমি কিভাবে বুঝবো যে সে আল্লাহওয়ালা নাকি শয়তানওয়ালা? আল্লাহওয়ালা যখন মুর্দা ক্বলবের উপর নজর দিবে তখন তা জিন্দা হয়ে যাবে। অর্থাৎ শারাহ-এ-সদর হয়ে যাবে। কিন্তু শয়তানের পক্ষে তা করা সম্ভব নয়। এটা এর বাতেনি অর্থ।
তাই পীর-এ-কামিল-তরিকত এর কাজ মুরিদকে বায়েত করে তার ভিতরে আল্লাহর যে নকশা আছে তার দিদার করানো। আরশে এলাহী পর্যন্ত পৌঁছানো তার কাজ নয়। আরশে এলাহী পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে এর পরবর্তীতে পীর-এ-কামিল-হাকিকত এর শরণাপন্ন হতে হয়।
আর যাদের অন্তর শক্ত হয়ে গিয়েছে তাদের অন্তরে কখনই আল্লাহর নাম বা জিকির বা নূর প্রবেশ করতে পারে না। তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালা ধ্বংস কামনা করেছেন এবং তাদেরকে পথভ্রষ্ট বলে আখ্যায়িত করেছেন। এখানে শক্ত অন্তর বলতে বোঝানো হয়েছে যে অন্তরে আল্লাহর জন্য কোন ভালবাসা নেই, আছে শুধু দুনিয়ার মোহ আর বেহেশতের লোভ। গায়র আল্লাহ বা আল্লাহ ভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে মশগুলা থাকতে থাকতে আমাদের অন্তর শক্ত হয়ে যায়, সেখানে আল্লাহর নাম ইসমে জাত (الله) প্রবেশ করতে পারে না। ক্বলবে আল্লাহর জিকির চালু হয় না। ফলে ‘শারাহ-এ-সাদর’ ও আর সম্ভব হয় না।
তাই পবিত্র কোরান মতে ইসলামে প্রবেশ করতে হলে আমাদেরকে ‘শারাহ-এ-সাদর’ অবশ্যই করতে হবে, এর কোন বিকল্প নেই। ইসলামের অপর নামই ‘শারাহ-এ-সাদর’। আর এর জন্যই প্রয়োজন আল্লাহ কর্তৃক নিযুক্ত একজন কামিল মুর্শিদ। কামিল মুর্শিদ ব্যতীত একা একা এটা কখনই সম্ভব নয়। আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূল, ওলী-আউলিয়াদেরকে পাঠিয়েছেনই সাধারণ মানুষদের ‘শারাহ-এ-সাদর’ করার জন্য। বর্তমানে বেলায়েত সমাপ্ত হয়ে গিয়েছে। তাই এখন এ দায়িত্ব পালনের জন্যই এসেছেন ইমাম মেহদী রিয়াজ আহমেদ গওহর শাহী। তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তাঁর সকল অনুসারীদের ‘শারাহ-এ-সাদর’ করবেন এবং আল্লাহর দীদার লাভের সৌভাগ্য দান করবেন।
তাই যারা ‘শারাহ-এ-সাদর’ করতে সক্ষম হয়েছেন তাঁরাই আসল হেদায়েত প্রাপ্ত হয়েছেন, আর যারা ‘শারাহ-এ-সাদর’ করতে পারেননি তারাই প্রকৃতপক্ষে পথভ্রষ্ট হয়েছেন। আমরা গুনাহকে গুমরাহি মনে করি। কিন্তু গুনাহ গুমরাহি নয়। বরং ক্বলবে আল্লাহর জিকির প্রবেশ না করাই গুমরাহি। আর এসব লোকদের জন্য আল্লাহ নিজেই ধ্বংস কামনা করেছেন। তাদের নামাজ, রোজা, হজ্জ্ব, জাকাত আল্লাহর নিকট অগ্রহণযোগ্য। কারণ তারা তো ইসলামেই দাখিল হতে পারেনি।
