হেদায়েত ও মুহাম্মদ (সাঃ)
ইউনুস আল-গওহর

বর্তমান সময়ে অনেকে বলে থাকেন, মুহাম্মদ (সাঃ) কাউকে হেদায়েত দিতে পারেন না। হেদায়েতের মালিক আল্লাহ-তায়ালা নিজেই। তারা এর স্বপক্ষে কোরানের এই আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেনঃ
সূরা আল-কাসাস, আয়াত নং ৫৬ (২৮:৫৬)
ইন্নাকা লা তাহদী
নিশ্চয় আপনি হেদায়েত দিতে পারেন না
মান আহবাবতা
যাকে আপনি ভালবাসেন
ওয়ালাকিন্না
বরং
আল্লাহা ইয়াহদী
আল্লাহ্ হেদায়েত দেন
মান ইয়াশা উ
যাকে ইচ্ছা তাকে
বিষয়টির গভীরে একটু আলোচনা করা যাক।
আল্লাহ-তায়ালা তাঁর খাস বান্দাদের ১ – ৩ বছরের পরীক্ষা নেন। পরীক্ষায় পাস করলে তখন আল্লাহ-তায়ালা বলেন,
সূরা আল-ফজর, আয়াত নং ২৭-২৮ (৮৯:২৭-২৮)
ইয়া আইয়াতুহান নাফছুল মুতমায়িন্নাতু
হে নফস-এ-মুতমায়েন্নাহ ওয়ালা
ইরজিয়ী ইলা রাব্বিকা
তোমার রবের নিকটে আসো
রাদিয়াতাম
আমি তোমার উপর রাজি
মারদিয়াতান
তুমিও আমার উপর রাজি
‘রাদিয়া-মারদিয়া’ এমন এক মকাম যেখানে আল্লাহ কিছু বললে তা বান্দাকে মানতে হয়, আবার বান্দা কিছু বললে আল্লাহকে তা মানতে হয়। এমনকি তা শরিয়ত পরিপন্থী হলেও। দুই পক্ষই এই ওয়াদার ফয়দা নিয়ে থাকেন।
আল্লাহ্ তার বান্দাকে বলেন, উমুক জায়গায় আমার এক আজলী মোমিন রূহ আছে, কিন্তু সে কোনো পথ পাচ্ছে না। তুমি যাও তাকে আমার পথে নিয়ে আসো। বান্দা তার ওয়াদা মাফিক তাই করতে চলে যায় এবং তা করতে যত কষ্টই আসুক না কেনো সে তা হাসি মুখে মেনে নেয়।
তেমনি অনেক সময় কোনো আজলি জাহান্নামী রূহ কোনো কামিল মুর্শিদের কাছে চলে আসে এবং সব কিছু ছেড়ে সে মুর্শিদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করে। এভাবে চলতে থাকার পর, মুর্শিদ একদিন তার উপর রাজি-খুশী হয়ে যান এবং আল্লাহর কাছে তার মুরিদের জন্য আরজ করেন, “হে আল্লাহ্, আমার এই মুরিদ একজন আজলি জাহান্নামী রূহ। তুমি তার উপর তোমার রহমত নাজিল করো এবং তার তকদির বদলিয়ে দাও।” তখন আল্লাহ্ বলেন, “ঠিক আছে। তুমি যা চাও তাই তার তকদিরে লিখে দাও।” এটা শরীয়ত পরিপন্থী হলেও, রাদিয়া-মারদিয়া ওয়াদার কারণে আল্লাহ্ তা মানতে বাধ্য হন। আর এজন্যই মুর্শিদের খিদমত করা সব থেকে বড় এবাদত। কিন্তু তা অবশ্যই নিঃস্বার্থভাবে করতে হয়।
অনেক নবী-রাসূল-আম্বিয়া অনেক নারীদেরকে তাদের কানিজ বানিয়েছিলেন। কানিজ কি? জাহেরিভাবে কোনো নারীকে বিবাহ করলে সে হয় স্ত্রী। আর বাতেনিভাবে কোনো নারীকে বিবাহ করলে সে হয় কানিজ। স্ত্রীর তার স্বামীর জাহেরি সম্পদের উপর হক থাকে। আর কানিজের তার স্বামীর জাহেরি সম্পদের উপর কোনো হক থাকে না, তার হক থাকে স্বামীর বাতেনি সম্পদের উপর। এ কারণে অনেক আজলী জাহান্নামী রূহ কানিজ হওয়ার কারণে মৃত্যুর পর জান্নাতে প্রবেশ করবে। প্রকৃতপক্ষে, এসব আজলী জাহান্নামী রূহদের মুক্তির জন্যই নবী-রাসূল-আম্বিয়ারা তাদেরকে কানিজ বানিয়েছিলেন।
এই ‘রাদিয়া-মারদিয়া’ ও ‘কানিজ’ বানানোর বিধান আল্লাহ-তায়ালা তাঁর খাস বান্দা নবী-রাসূল, ওলী-আউলিয়াদের জন্য রেখেছেন। যার মাধ্যমে তারা আজলী জাহান্নামী রূহদেরকেও হেদায়েত দিতে পারতেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন নবী বা রাসূল বা ওলী যদি আজলী জাহান্নামীদেরকে হেদায়েত দিতে পারেন, তাহলে আমাদের নবী মুহাম্মদ (সাঃ) তা পারেন না? ওনার মান-মর্যাদা সম্বন্ধে কি আমাদের কোনই ধারণা নেই? আমরা কি এতটাই নির্বোধ হয়ে গেলাম?
আল্লাহ-তায়ালা তাঁর হাবীব সম্বন্ধে বলেছেন,
সুলতান হক বাহু রচিত ‘আইনুল ফকর’ গ্রন্থের ৪০ নং পৃষ্ঠা
লাওলাকা লামা খালাকতুল আফলাক
হে হাবিব! আপনি না থাকলে আমি এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করতাম না
লাওলাকা লামা আজহারতুর রাবুউবিয়াত
আপনি না থাকলে আমি আমার প্রভুত্ব জাহির করতাম না
আল্লাহ-তায়ালা তার পরিচয় দান করার জন্য এবং তার দিদার ও জিকিরের জন্য শুধুমাত্র মোস্তফা (সাঃ) কে সৃষ্টি করেছেন, আর বাকি সব মাখলুককে মোস্তফা (সাঃ) এর দিদার ও জিকিরের জন্য সৃষ্টি করেছেন। বিশ্ব জগতের সবকিছুই যখন হুজুর পাক (সাঃ) এর জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তখন তিনি যাকে ভালবাসেন তাকে হেদায়েত দিতে পারবেন না? আল্লাহ তাঁর হাবীবের এই সামান্য অনুরোধ রাখবেন না? এটা কখনো হতে পারে? আল্লাহর হাবীব সাধারণ ওলী-আউলিয়াদের চেয়েও ছোট হয়ে গেলেন?
হুজুর পাক (সাঃ) বলেছেন,
আল-হাদিস
সহীহ আল-বুখারী, কিতাবুল ঈমান, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালোবাসা ঈমানের অংশ,
হাদিস নম্বর ১৫
কালান নাবিয়্যু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম: লা ইউমিনু আহাদুকুম হাত্তা আকুনা আহাব্বা ইলাইহি মিন ওয়ালেদিহী ওয়া ওয়ালাদিহী ওয়ান্নাসি আজমাঈন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং সব মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।”
তারমানে হুজুরের প্রতি মোহাব্বতই ঈমান। আমরা যদি হুজুর পাক (সাঃ)-কে সব থেকে বেশী মোহাব্বত করি তবেই মোমিন হতে পারবো, অন্যথায় নয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা যদি হুজুর পাক (সাঃ)-কে মোহাব্বত করি তাহলে হেদায়েত পাবো, আর হুজুর যদি কাউকে মোহাব্বত করেন তাহলে সে কি পাবে? গুমরাহি? নিজের বিবেকের কাছে এই প্রশ্নটা করে দেখেন। আপনার বিবেক আপনাকে কি উত্তর দেয় তা শোনেন।
হুজুর পাক (সাঃ) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন,
আল-হাদিস, আলা আল-সাহিহাইন (খণ্ড ৩, হাদিস ৪৭৩৮), মুসনাদে আহমদ (হাদিস ২৬৫০০)
আল্লাহুম্মা ইন্নাহা বাদ আতুম মিন্নী, ফামান আহাব্বাহা ফাকাদ আহাব্বানী, ওয়া মান আবগাদাহা ফাকাদ আবগাদানী। আল্লাহুম্মা ওয়ালি মান ওয়ালাহা, ওয়া আদি মান আদাহা।
হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই সে (ফাতিমা) আমার শরীরের একটি অংশ (কলিজার টুকরো)। সুতরাং যে তাকে ভালোবাসলো, সে যেন আমাকেই ভালোবাসলো; আর যে তার প্রতি বিদ্বেষ রাখলো, সে যেন আমার প্রতিই বিদ্বেষ রাখলো। হে আল্লাহ! যে তাকে ভালোবাসে, তুমিও তাকে ভালবাসো; আর যে তার সাথে শত্রুতা করে, তুমিও তার সাথে শত্রুতা করো।
হুজুর পাক (সাঃ) বিবি ফাতেমা (রাঃ) সম্বন্ধে আল্লাহকে এ অনুরোধ কেনো করেছিলেন? কারণ হুজুর বিবি ফাতেমাকে অত্যন্ত মোহাব্বত করতেন। বিবি ফাতেমা ছিলেন হুজুরের কলিজার টুকরা। এ থেকে বোঝা যায় হুজুর যাকে মোহাব্বত করবেন, তার জন্যই আল্লাহর কাছে তাঁর রহমতের জন্য দোয়া করবেন। আর আল্লাহ্ তাঁর হাবীবের দোয়া কি কখনো প্রত্যাখ্যান করতে পারেন? ‘রাদিয়া-মারদিয়া’-র ওয়াদার কারণে আল্লাহ্ যদি কোনো ওলীর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান না করেন, তবে তিনি তাঁর হাবীবের অনুরোধ কিভাবে প্রত্যাখ্যান করবেন? কথায় যুক্তি আছে কিনা? তাহলে হুজুর পাক (সাঃ) যাকে মোহাব্বত করেন তাকে কি হেদায়েত দিতে পারেন না? অবশ্যই পারেন। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে হেদায়েত দিতে পারেন। কারণ কোরান শরীফে আল্লাহ্ নিজেই বলেছেন,
সূরা আশ-শূরা, আয়াত নং ৫২ (৪২:৫২)
ওয়া ইন্নাকা লা তাহদী ইলা সিরাতিম মুস্তাকিম
নিশ্চয় আপনিই সিরাতুল মুস্তাকিম
সূরা আল-কাসাস এর ৫৬ নং আয়াতটি স্পষ্টতই এই আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক। কোরাইশদের মধ্যে দুই গোত্র ছিল – বানু হাশিম ও বানু উমাইয়া। হুজুর পাক (সাঃ) ছিলেন বানু হাশিম গোত্রের। আর আবু বকর, উমর, উসমান এরা ছিলেন বানু উমাইয়া গোত্রের। হুজুর তাঁর আহলে বায়েতদেরকে খুব মোহাব্বত করতেন। আর কোরান মতে আহলে বায়েতদের প্রতি মোহাব্বত ইসলামের অঙ্গ।
সূরা আশ-শূরা, আয়াত ২৩ (৪২:২৩)
কুল লা আসআলুকুম আলাইহি আযরান ইল্লাল মাওয়াদ্দাতা ফিল কুরবা
“হে মোহাম্মাদ (সাঃ), আপনি আপনার লোকদেরকে বলুন, আমি আমার পরিবারবর্গের প্রতি মোহাব্বত ব্যতীত তোমাদের কাছে এর (ইসলাম ধর্মের) বিনিময়ে অন্য কোন প্রতিদান চাই না”
অর্থাৎ আহলে বায়েতদের প্রতি মোহাব্বতই আমাদের ঈমানের ভিত্তি। সাহাবীদের মাঝেও আহলে বায়েতদের প্রতি অত্যন্ত মোহাব্বত ছিল। আর এটাই বানু উমাইয়াদের গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা মনে করতো, সবাই যদি এভাবে আহলে বায়েতদেরকে উচ্চ মর্যাদাশীল মনে করে, তবে আরবরা তো আর অন্য কাউকে মানবে না। সবাই তো আহলে বায়েতকে মানবে। তাদের বংশধরদেরকে মানবে। ফলে বানু উমাইয়ারা তো কখনই ইসলামে গুরুত্ব পাবে না। এজন্য হুজুর পাক (সাঃ) এর ওফাতের পর তারা ষড়যন্ত্র করে মওলা আলীর স্থলে আবু বকরকে খলিফা বানিয়েছিল, যাতে খেলাফত বানু হাশিমের ভিতরে না যায়। তখন থেকেই তারা বানু হাশিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। মওলা আলীকে খেলাফত থেকে দূরে রেখেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ১৫০ বছর পর উসমান যখন কোরানের কিতাবী রূপ দিলো, তখন তারা নিজেদের মত করে কোরানের আয়াত সাজিয়েছিল। তারা মওলা আলীর কাছে রক্ষিত কোরানের আয়াত পুড়িয়ে ফেলেছিল। সেগুলো বাদ দিয়ে কোরান সংকলন করেছিল। আহলে বায়েত সম্বন্ধে যে সব আয়াত ছিল তা বাদ দিয়ে দেয় এবং সেখানে বেশ কিছু জাল আয়াত সংযোজন করে। সূরা আল-কাসাস এর ৫৬ নং আয়াতটিও এমনি একটি জাল আয়াত। যা কোরানের অন্যান্য আয়াতের সাথে স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক।
প্রকৃতপক্ষে মোহাম্মদ (সাঃ)-ই সিরাতুল মুস্তাকিম অর্থাৎ তিনিই হেদায়েতের রাস্তা। তিনি যাকে মোহাব্বত করেন তাকেই হেদায়েত দান করেন।